Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ১২৫ বার পঠিত

ফেরদৌস সিহানুক শান্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জঃ

পদ্মা নদী পার হতে নৌপথেই সময় লাগে ঘণ্টাখানেকের বেশি। পদ্মা পেরিয়ে একটি বিছিন্ন জনপথ সীমান্তঘেঁষা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চল। সেখানকার মানুষ এখনো জানে না বিদ্যুতের ব্যবহার। বঞ্চিত বিদ্যুতের সব ব্যবহার থেকে। এখানকার পরিবেশ ও জীবনযাপন দেখে মনে হবে সভ্যতার আলো থেকে দূরের কোনো অঞ্চল। কিন্তু এবার পাল্টে যাচ্ছে সেই চিত্র।

ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫টি ইউনিয়নের প্রায় আট হাজার পরিবার এবার বিদুৎ সেবার আওতায় আসছে। ইতোমধ্যেই বাড়ির সামনে পর্যন্ত বৈদুতিক পোল ও তার সংযোগ দেওয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে এলাকায় বইছে খুশির জোয়ার।

সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে পদ্মা নদীর তলদেশ দিয়ে বিদুৎ-সংযোগ যাবে বিছিন্ন চরাঞ্চলে। সংযোগ দেওয়ার পরপরই প্রাথমিকভাবে উজিরপুর ইউনিয়নের ১টি, দুর্লভপুরের ১টি, নারায়ণপুরের ৮টি ওয়ার্ড এবং সুন্দরপুর ও পাঁকা ইউনিয়নের কিছু অংশ মিলে মোট ২৮টি গ্রামের ৪০ হাজার পরিবার বিদুৎ সেবার আওতায় আসবে।

ইতোমধ্যে ১০৭ কিলোমিটারের মধ্যে দীর্ঘ ৯০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ সম্পন্ন করা হয়েছে। পদ্মা নদীর তলদেশ দিয়ে বৈদ্যুতিক তার পরিবহনের জন্য সাবমেরিন কেবল নদী পাড়ে নিয়ে আসা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও পল্লী বিদুৎ সমিতি বলছে, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে চরাঞ্চলবাসীর। সীমান্তঘেঁষা চরাঞ্চলে বিদুৎ সেবা একটি বড় মাইলফলক হতে যাচ্ছে। বিদুৎ-সুবিধার ফলে এই অঞ্চলের অনুন্নত জনপদে আসবে বৈকল্পিক পরিবর্তন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়াও কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসায় উন্নয়ন ঘটবে। সেই সঙ্গে বাড়বে সামাজিক উন্নয়ন।

এই চরাঞ্চলে বর্তমানে সোলার প্যানেলই একমাত্র ভরসা। তবে সিংগভাগ খেটে খাওয়া ও অসহায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বসবাস হওয়ায় হাতেগোনা কিছু পরিবার ছাড়া কোথাও সোলারের ব্যবহার নেই। তাই হারিকেন-কুপিই ভরসা সীমান্তবর্তী এলাকার হাজারো মানুষের। ইতোমধ্যে সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের হায়াত মোড়ে সাব-স্টেশন নির্মাণের কাজ শেষ করা হয়েছে।

নারায়ণপুর দারুল আলিম মাদ্রাসায় আলিম প্রথম বর্ষের ছাত্র আব্দুল হালিম বলেন, ঝড়বৃষ্টি হলেই আমরা ক্লাস করতে পারি না। মাদ্রাসায় একটি কম্পিউটার আছে, দু-এক দিন রোদ না উঠলে কম্পিউটার ক্লাস করতে পারি না। গরমের সময় ক্লাস করতে গিয়ে অনেক ছাত্রছাত্রী অসুস্থ হয়ে যায়। এমনকি গ্রীষ্মের সময় বিরতি দিয়েও ক্লাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিদুতের সংযোগ এলে আর কষ্ট হবে না৷ বিদুৎ পেলে ফ্যান, কম্পিউটার চালু থাকবে। আমাদের পড়াশোনার গতিও বাড়বে।

কৃষক মো. সমশের আলী জানান, চরাঞ্চলে বিদুৎ না থাকায় নানা রকম অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়। এক বিঘা ধান চাষ করতে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। বিদুৎ-সুবিধা পেলে কৃষি খাতে খরচ অর্ধেকে নেমে আসবে। এক কেজির বেশি মাংস কিনতে পারি না। কারণ এখানে ফ্রিজের কোনো সুবিধা নাই। চরাঞ্চলের মানুষের একটি বড় সমস্যা মোবাইল চার্জ করা নিয়ে। হাতে গোনা কয়েকটা বাড়িতে সোলার আছে। তাই প্রতিদিন মোবাইল চার্জ করা নিয়ে বাড়ি বাড়ি দৌড়াতে হয়। এবার মুক্তি মিলবে।

চরপাঁকা মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ সেতাউর রহমান বলেন, এখানে বিদুৎ এলে এই অঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। গরমের সময় মসজিদে মুসল্লিরা সঠিকভাবে ধীরেসুস্থে নামাজ আদায় করতে পারে না। তাদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় দ্রুত নামাজ শেষ করতে হয়। বিদুৎ এলে ফ্যানের বাতাসে শান্তিতে নামাজ আদায় করতে পারব।

পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৮ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য তরিকুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলে বিদুৎ-সুবিধা আসবে, এটা আমাদের স্বপ্নের বাইরে। দেশনায়ক শেখ হাসিনার দুটি যুগান্তকারী উদ্যোগে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। গৃহহীনদের জন্য ঘর নির্মাণ ও বিদুতের উন্নয়ন দেশকে অন্যন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আমরা জানি, উন্নয়নের প্রধান নিয়ামক হলো বিদুৎ। এই প্রকল্পে কোনো অনিয়ম না করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টির আহ্বান জানান তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লী বিদুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদুৎ’ এই স্লোগান বাস্তবায়নে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৮টি সীমান্তবর্তী গ্রামে প্রাথমিকভাবে ৭৪০০ পরিবার বিদুৎ সরবরাহ পাবে। বর্তমানে অফগ্রিডের কাজ চলমান রয়েছে। বৈদ্যুতিক লাইনের কাজ শেষ হয়েছে। সদর উপজেলার মিরের চর এলাকায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সাবমেরিন রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া পাঁকা থেকে নারায়ণপুরের জন্য আরও ২০ কিলোমিটার সাবমেরিন আসবে। বর্তমানে পদ্মায় প্রচুর স্রোত, তাই এটি কমতে শুরু করলে খুব শিগগিরই সাবমেরিন স্থাপনের কাজ শুরু হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ডা. শামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল বলেন, বাংলাদেশের কোনো প্রত্যন্ত এলাকা বিদুৎবিহীন থাকবে না, প্রধানমন্ত্রীর এমন উদ্যোগের ফলে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা পাল্টে যাবে।

চরাঞ্চলে বিদুৎ-সুবিধা হলে এখানকার যাতায়াত ব্যবস্থা, তথ্য-প্রযুক্তি খাত উন্নয়ন হবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে। শতভাগ বিদুৎতায়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিদ্যুতের ফলে জীবনযাত্রায় আসবে ব্যাপক পরিবর্তন।

উল্লেখ্য, প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছিল চলতি বছরের ৩০ জুন। তবে পদ্মায় অতিরিক্ত পানিপ্রবাহ ও স্রোত থাকায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে বলে জানিয়েছে পল্লী বিদুৎ সমিতি।

 

 

ফেরদৌস সিহানুক শান্ত

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

০১৭৫৮৩৫৪২৭১

Please Share This Post in Your Social Media

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর